পটুয়াখালীর রাজনীতিতে দীর্ঘ তিন দশকের সমীকরণ পাল্টে দিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে প্রথমবারের মতো জয়ের মুখ দেখল বিএনপি জোট। সরাসরি ‘ধানের শীষ’ প্রতীক না থাকলেও, বিএনপির সমর্থনপুষ্ট গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ‘ট্রাক’ প্রতীক নিয়ে এই ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দিনভর টানটান উত্তেজনার পর রাতে ঘোষিত ফলে দেখা যায়, ৯৬ হাজার ৭৬৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন (ঘোড়া প্রতীক) পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৭৬ ভোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের পকেটে। এর আগে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে আসনটি ছিল জাতীয় পার্টির দখলে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলেও আওয়ামী লীগসহ সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কোনো সাধারণ নির্বাচনে কখনোই এখানে বিএনপি জিততে পারেনি। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর নুরের হাত ধরেই সেই আক্ষেপ ঘুচল বিএনপির।
আসনটির গত কয়েক দশকের চালচিত্র ছিল অনেকটা এমন, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০১৪: আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন (আওয়ামী লীগ)। এরপর ২০০৮ সালে গোলাম মাওলা রনি (আওয়ামী লীগ), ২০১৮, ২০২৪ সালে এস এম শাহজাদা (আওয়ামী লীগ), অবশেষে ২০২৬ সালে নুরুল হক নুর (গণঅধিকার পরিষদ-বিএনপি জোট)
এবারের নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে মূল লড়াই ছিল ‘ট্রাক’ এবং ‘ঘোড়া’ প্রতীকের মধ্যে। নির্বাচনের শুরু থেকেই নুর এবং মামুনের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশেই ভোট সম্পন্ন হয়।
বিজয়ী হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নুরুল হক নুর বলেন, "এই জয় সাধারণ মানুষের জয়। দীর্ঘ সময় পর এই জনপদের মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পেয়েছে। দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে সবার জন্য কাজ করাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।"
এদিকে, পরাজয় মেনে নিয়ে নুরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাসান মামুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি নুরের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।
পটুয়াখালীর এই ফলাফলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপিসহ জোটের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এখন বইছে বাঁধভাঙা আনন্দ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ‘দুর্গ’ পতনের এই ঘটনায় জেলা রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

