ফুলবাড়ীর জমিদারবাড়ির শিব মন্দিরে চতুদর্শী ব্রত পালনে ভক্তের ঢল
ছবিঃ বিপ্লবীবার্তা

উৎসব মূখর পরিবেশে সনাতন ধর্মালম্বীদের শিব চতুদর্শী ব্রত পালনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ঐতিহ্যবাহী জমিবাড়ীর শিব মন্দিরে হাজারও ভক্তের ঢলে মূখরিত প্রাঙ্গণ। বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর ব্রত পালনে ঐতিহ্যবাহী নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ীর প্রাঙ্গণে স্থানীয় সনাতন ধর্মালম্বীরা শিব চতুদর্শী ব্রত পালনে শিব মন্দিরে পূজা অর্চনা, ভজন সংগীতসহ নানা কর্মসুচি পালন করা হয়।


এই দিনটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্রী শ্রী শিব চর্তুদর্শী তিথি ও মহা শিবরাত্রী উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন শিব মন্দিরের পাশাপাশি পারিবারিক মন্দিরগুলোতে পূজা-অর্চনা উৎসবটি পালন করে।


বরিবার (১৫ ফেব্রুয়ারী) সন্ধ্যা ৬ টার পর শিব চর্তুদর্শী তিথি অনুযায়ী পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ঐদিন ৮টা থেকে নাওডাঙ্গা শিব মন্দিরে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্ত ভিড় ভক্তের সমাগম বাড়হে থাকে। রাত সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত নারীভক্তরা শিব মন্দিরে এসে দুধ, কলা, মোমবাতি জ্বালিয়ে শিবের কাছ স্বামীর মঙ্গল কামনা করেছেন। নারী ভক্তের পাশাপাশি কুমারী মেয়ে ভালো বরের আশায় শিব মন্দিরে এসে বিশেষ প্রার্থনা করতে দেখা গেছে। 


রবিবার রাতে ও সোমবার দুপুরে গিয়ে নাওডাঙ্গা শিব মন্দির কমিটিসহ আগত ভক্তদের সাথে কথা হলে তারা জানান, বছর বাংলা বর্ষপঞ্জির ফাল্গুন মাসের চর্তুদশী তিথিকে শিব চর্তুদশী বা মহা শিবরাত্রী বলা হয়। 


এইদিন রাত সাড়ে ৭ টায় শিব চতুদর্শী ব্রত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন পুরোহিত। 


এই আনুষ্ঠানিকতা চলে রাত সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত। পরদিন সোমবার সকাল থেকে আবারও পূজা অর্চনা শুরু হয় নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির শিব মন্দিরে। সকল থেকে শিব চতুদর্শী ব্রত উপলক্ষে শতশত কুমারি মেয়েরাসহ বিবাহিত নারী-পুরুষ ভক্তদের ঢলে মুখরিত জমিদারবাড়ির মন্দির প্রাঙ্গণ।  


দুর-দুরান্তর থেকে আসা শতশত কুমারি মেয়ে, বিবাহিত নারী-পুরুষ ভক্তরা হাতে হাতে দুধ, কলা, আপেল, চিনি, আগরবাতি শিব (বার্নের পূজা) করা জন্য মন্দিরে প্রার্থনা করেন। এ সময় কুমারী মেয়েরা ভাল বরসহ মনের আশা পুরণ ও বিবাহিত নারীরা স্বামীর সংসারে শান্তির লক্ষ্যে শিবের চরণে বিশেষ প্রার্থনা করেন।


পূজা অর্চনা শেষে রাত ব্যাপি ভজন সঙ্গীতের আয়োজন করেন আয়োজক কমিটি।  দুইদিন ব্যাপি ব্রত থাকায় সোমবার সন্ধ্যায় শিব চতুদশী ব্রত পালনের আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটে।  


উত্তরের জেলা কুড়িগামের ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দুরে নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের নাওডাঙ্গা ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ীর প্রাঙ্গণে অতি প্রাচীনতম একটি শিব মন্দির। অবিভক্ত ভারতবর্ষে অনেক আগে নাওডাঙ্গা পরগনার জমিদার বাহাদুর শ্রীযুক্ত বাবু প্রমদা রঞ্জন বক্সী এটি নির্মাণ করেন। আট দেয়াল বিশিষ্ট এই মন্দিরের উচ্চতা ৩০ ফুট ব্যাস ২০ ফুট এবং মন্দিরের ভেতরের ব্যাস ১২ ফুট। জমিদার আমলে শিব মন্দিরে পূজা হতো খুবেই জাঁকজমকপূর্ণভাবে।


মনের কামনা-বাসনায় বাবা শিবের কাছে প্রার্থনা করতে পেরে অনেকের ভালই লেগেছে। সেইসঙ্গে মন্দির কমিটির অত্যন্ত সুন্দর আয়োজনে দুর-দুরান্তর থেকে আসা ভক্তরা সুন্দর পরিবেশে শিবের কাছে প্রার্থনা করতে পাড়ায় খুশি ভক্তরা। 


স্থানীয় কুমারী মেয়ে প্রজ্ঞা রায়, স্মৃতি রায় ও অসীম চন্দ্র রায় বলেন, শিবের কাছে ভাল কিছু চাইলে বাবা শিব তা পুরণ করে। সেই লক্ষ্যেই তারা তিনজনেই মনের বাসনা পুরণসহ তাদের সংসারের শান্তির জন্য শিবের কাছে প্রার্থনাসহ কেউ ভাল শিবের মতো বর কেউ পার্বতীর মতো একজন জীবন সঙ্গীনী পাওয়ার বিশ্বাসে শিবের মন্দিরে এসে বিশেষ প্রার্থনা করেছেন।


নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির শিব মন্দিরের উদযাপন কমিটির সভাপতি সৌরেন্দ্র চন্দ্র গোস্বামী (পল্টু)  জানান, নাওডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী শিব মন্দিরটিতে আমরা প্রতি বছর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনদের নিয়ে পূজা অর্চনা করে আসছি। অন্যান্য বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণ ভাবে শিব চতুদশী ব্রত পালনে শতশত নারী ও কুমারী মেয়েরা শিবের মাথায় ফুল, দুধ ঢেলে পরিবারে সুখ-শান্তিসহ দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা করেন। সোমবার সন্ধায় শিব চতুদশী ব্রত পালনের আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটবে।


বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ফুলবাড়ী শাখার সভাপতি সুনীল চন্দ্র রায় জানান, অত্যান্ত উৎসব মূখর পরিবেশে নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যবাহী শিব চতুদর্শী ব্রত পালনে দুই দিন ব্যাপী শিব চতুদর্শী তিথি উপলক্ষে শতশত নারী-পুরুষ ও কুমারী মেয়েরা শিবের চরণ মাথায় দুধ ঢেলে মনের কামনা-বাসনার জন্য প্রার্থনা করেন। অনেক ভক্ত আবার দূর-দূরান্ত থেকে  পরিবার-পরিজন মিলে ব্রত পালনে বিশেষ প্রার্থনা করেন। সব মিলে নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির শিব মন্দিরসহ বিভিন্ন  মন্দিরে শান্তিপুর্ণ পরিবেশে শিব চতুর্দশী ব্রত পালন হয়েছে।