বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া সাম্প্রতিক 'রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট' বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি ভারতের পোশাক ও টেক্সটাইল রপ্তানিকারকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে 'শূন্য শুল্ক' সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিল্লির জন্য বড় ধরণের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা বা কৃত্রিম সুতা আমদানি করে এবং তা দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করে, তবে সেক্ষেত্রে কোনো শুল্ক দিতে হবে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও 'দ্য হিন্দু'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সুবিধার ফলে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকরা এখন আর ভারতীয় তুলার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি মার্কিন তুলার দিকে ঝুঁকবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ১.৪৭ বিলিয়ন ডলারের তুলা ও সুতা রপ্তানি করেছিল, যা তাদের মোট রপ্তানির একটি বিশাল অংশ। নতুন এই চুক্তির ফলে ভারতের এই বাজারটি সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে।
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার আরও একটি বড় কারণ হলো শুল্ক হার। বর্তমানে ভারতীয় পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। অপরদিকে, বাংলাদেশে সাধারণ শুল্ক ১৯ শতাংশ হলেও মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করলে তা শূন্য শতাংশে নেমে আসবে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির (CITI) সেক্রেটারি জেনারেল চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমার ভয় হচ্ছে এর তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভারতের ওপর। বাংলাদেশ তৈরি পোশাকে অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা যদি মার্কিন তুলা ব্যবহার করে শূন্য শুল্ক সুবিধা পায়, তবে বিশ্ববাজারে ভারতের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কমে যাবে।”
ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের টেক্সটাইল কমিটির চেয়ারম্যান সঞ্জয় কে জৈনের মতে, এর ফলে টি-শার্ট এবং মেয়েদের টপসের মতো ১০০ শতাংশ সুতির পণ্যের বাজারে ভারত তার একচেটিয়া আধিপত্য হারাতে পারে।
বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল বাণিজ্যিক ছাড় কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের সাথে ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতা ভারতকে কূটনৈতিকভাবেও কিছুটা চাপে ফেলেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের সুতা ও কাঁচামালের ওপর নির্ভর করা বাংলাদেশ এখন বিকল্প ও সাশ্রয়ী বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিচ্ছে, যা দিল্লির কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আরও স্পষ্ট করছে।
যদিও কিছু ভারতীয় ব্যবসায়ী মনে করছেন লজিস্টিকগত সমস্যার কারণে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, তবে মার্কিন শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশের পোশাক খাতকে যে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, তা এখন অনস্বীকার্য।

