দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রাম রাজনীতিতে বড় এক পালাবদলের স্বাক্ষী হলো এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যেখানে অতীতে জেলার ১, ২ ও ৩ নম্বর আসনে প্রভাব বিস্তার করেছিল জাতীয় পার্টির লাঙল, সেখানে এবার জেলার চারটির মধ্যে ৩ টি আসনেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা এবং একটিতে তাদের শরিক জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)'র শাপলা কলি।
দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে উত্তরাঞ্চলের এই জেলায়।
কুড়িগ্রাম ১, ২ ও ৩ আসন দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। স্থানীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং ব্যক্তি নির্ভর ভোট ব্যাংক ছিল তাদের মূল ভরসা।
তবে এ বারের নির্বাচনে সেই ভিত্তিতে স্পষ্ট ভাঙন দেখা গেছে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরপরই স্থানীয়দের মধ্যে নানান আলোচনায় উঠে আসে এটি কেবল প্রার্থী ভিত্তিক পরাজয় কিংবা দলীয় অবস্থানের দীর্ঘ মেয়াদী পরিবর্তন।
গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কুড়িগ্রাম ১ আসনে মোট কেন্দ্র-২৩১টি, ঘোষিত কেন্দ্র-২৩১ টিতে বিজয়ী হয়েছেন আনোয়ারুল ইসলাম, প্রতীক-দাড়িপাল্লা, দল-জামায়াত। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪৯৮ ভোট এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইফুর রহমান রানা,প্রতীক ধানের শীষ, দল- বিএনপি তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৩১৯ ভোট। অথচ এই আসনে জাপার মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক কুড়িগ্রাম টানা প্রায় ২৩ বছর সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপি ১ জন জনপ্রতিনিধি ছিলেন সেটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। এই আসনটিতে জাতীয় পার্টির পরাজিত হবার পিছনে দায়ী করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকা, সাধারণ জনগন জনপ্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ না থাকা এবং তরুণ ভোটারদের এনসিপির প্রতি ভালোবাসা।
কুড়িগ্রাম ২ আসনে মোট কেন্দ্র-২০৫টি,ঘোষিত ফলাফল-২০৫ টিতে দেখা যায়, বিজয়ী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) 'র ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ প্রতীক-শাপলা কলি নিয়ে তিনি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৯ ভোট পেয়েছেন এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ প্রতীক-ধানের শীষ নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৩৫ ভোট। আর দীর্ঘদিনের ক্ষমতায় থাকা জাতীয় পার্টির পনির উদ্দিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ১৩,৭৩৬ ভোট। জাতীয় পার্টির দখলে থাকা এ ই আসনে বিএনপির পরাজিত হওয়ার দায়ী করা হচ্ছে সদর উপজেলায় বিএনপির প্রার্থীর বাড়ি হওয়াতে জনসংযোগ কম করেছেন,জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যের সাথে সু-সম্পর্ক না থাকা, বালু মহল, টোল আদায় সহ এবং বিএনপির তরুণ সমর্থকদের নানা সময়ে উশৃংখল আচরণ কারণ দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও জাতীয় পার্টির পরাজিত হওয়ার বড় কারণ দায়ী করা হচ্ছে স্থানীয় সমস্যা সমাধান না করা,জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন না করা,তার শাসনামলে কোন উন্নয়ন না করা এবং জনগনের জন্য না হয়ে ব্যবসার জন্য জনপ্রতিনিধি হওয়া।
কুড়িগ্রাম ০৩ আসনে মোট কেন্দ্র-১৪০টি,ফলাফল ঘোষিত-১৪০টিতে দেখা যায়, বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামির মাহবুবুল আলম সালেহী। তিনি প্রতীক- দাঁড়িপাল্লা নিয়ে পেয়েছেন ১লাখ ০৬ হাজার ৯৩৩ ভোট এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির তাসভীর উল ইসলাম প্রতীক-ধানের শীষ নিয়ে পেয়েছেন ৭৮,৯৮২ ভোট। এই আসনটিও দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দখলে থাকলেও সাংগঠনিক দূর্বলতা,যোগাযোগ না থাকা, হিন্দু ও নারী ভোটাদের উপেক্ষিত রাখা আর চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থার উন্নয়ন না করায় জাপা দুর্গ ভেঙে গেছে।
কুড়িগ্রাম ০৪ আসনটে মোট কেন্দ্র-১৩০টির ঘোষিত ১৩০ টির ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামির মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি প্রতীক দাড়িপাল্লা নিয়ে পেয়েছেন ৮১ হাজার ৬৯৬ ভোট এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আপন বড় ভাই আজিজুর রহমান প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে পেয়েছেন ৬৫ হাজার ৬২৪ ভোট। এই আসনটি আ.লীগের দখলে দীর্ঘদিন থাকায় এখানে নতুন করে জামায়াত দখলে নিলো। জামায় ইসলামি এখানে জয়ী হওয়ার পিছনে দুই ভাইয়ের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ছোট ভাই পরিচ্ছন্ন এবং এলাকায় সুনামের কারণ হিসেবে দেখছেন সাধারণ ভোটাররা।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের জয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন মজবুত করা, তরুণ ভোটারদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং মাঠ কেন্দ্রিক প্রচারণা এই তিনটি বিষয়কে অনেকেই তাদের সাফল্যের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক প্রচার এবং ঘরোয়া বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের প্রত্যাশাই ছিল তাদের মূল বিবেচ্য বিষয়। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন একই ধারা দেখার পর তারা পরিবর্তন চেয়েছেন। তবে কতটা প্রত্যাশা পূরণ হবে সেটি সময়ই বলে দেবে।
কুড়িগ্রামে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের থেকে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার বেশি ছিলো। এবারের নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি ও সক্রিয়তা ছিল আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে। নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ সংগঠিতভাবে জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

