নওগাঁ-১ আসনে ত্রিমুখী লড়াই
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার) আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানকে যেমন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তেমনি নিজ দলের স্বতন্ত্র ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ডা. ছালেক চৌধুরীর কারণেও পড়তে হচ্ছে চাপে। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী।


অতীতের জোটভিত্তিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো—২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালে—এই আসনটি বিএনপিকে ছেড়ে দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। তবে এবার আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় পাল্টে গেছে সমীকরণ। মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও স্থানীয় ভোটারদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যেই মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে।


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ আসনে জয়-পরাজয় অনেকটাই নির্ভর করবে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য, মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা এবং ইসলামী ভোটব্যাংকের বিভাজনের ওপর। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোটারদের অবস্থানও ফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।


এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচ প্রার্থী হলেন—


বিএনপি: মোস্তাফিজুর রহমান

জামায়াতে ইসলামী: মাহবুবুল আলম

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: আব্দুল হক শাহ্

জাতীয় পার্টি: আকবর আলী

স্বতন্ত্র: ডা. ছালেক চৌধুরী


তাদের মধ্যে তিনজনের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা রয়েছে। ডা. ছালেক চৌধুরী বিএনপির মনোনয়নে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম সংসদে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের কাছে পরাজিত হন; তখন তিনি পান ১ লাখ ৪৪ হাজার ভোট। জাতীয় পার্টির প্রার্থী আকবর আলীও আগের দুই নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় পাননি। অন্যদিকে জামায়াতের মাহবুবুল আলম ও ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল হক শাহ্ প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।


নওগাঁর ছয়টি আসনের মধ্যে নওগাঁ-১ এ ভোটার সবচেয়ে বেশি। মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫ জন। এর মধ্যে নারী ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৪, পুরুষ ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭৭ এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৪ জন।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলা বিএনপি দুই ধারায় বিভক্ত—ডা. ছালেক চৌধুরী ও মোস্তাফিজুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে। মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ছালেক চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় গত ৫ জানুয়ারি তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার পক্ষে কাজ করায় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


তবে বিএনপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান দাবি করেন, বর্তমানে দলে কোনো বিভক্তি নেই এবং সব ইউনিট তার পক্ষে কাজ করছে। তার ভাষ্য, ধানের শীষের ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যেও তিনি ভালো সাড়া পাচ্ছেন; এ আসনে সংখ্যালঘু ভোটার ৮০ হাজারের বেশি।


অন্যদিকে ডা. ছালেক চৌধুরী বলেন, কর্মী-সমর্থকদের চাপে তিনি প্রার্থী হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।


এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আব্দুল হক শাহ্ এলাকায় শক্ত অবস্থানে থাকায় ইসলামী ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা জামায়াতের প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের দাবি, নওগাঁ-১ আসনে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে।


তবে জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে গণসংযোগ ও দলগত প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন।


সব মিলিয়ে নওগাঁ-১ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে, যেখানে দলীয় ঐক্য, ভোটব্যাংকের সমীকরণ এবং শেষ মুহূর্তের কৌশলই নির্ধারণ করতে পারে ফলাফল।