আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি, পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৯ সালের এই দিনে তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই নৃশংস ঘটনার স্মৃতি আজও জাতিকে ব্যথিত করে। ২০২৫ সাল থেকে এই দিনটি ‘জাতীয় শহিদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে এবং বরাবরের মতো এবারও বিনম্র শ্রদ্ধায় শহিদদের স্মরণ করা হচ্ছে।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, সকাল ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে বিজিবির বার্ষিক দরবার চলাকালে হঠাৎ একদল বিদ্রোহী সৈনিক দরবার হলে ঢুকে তৎকালীন মহাপরিচালকের ওপর অস্ত্র তাক করেন। মুহূর্তেই পুরো পিলখানা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিদ্রোহীরা পরিকল্পিতভাবে সেনা কর্মকর্তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলেন। পিলখানার চারটি প্রবেশপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা চারদিকে গুলিবর্ষণ করতে থাকেন। দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টা ধরে চলে এই তাণ্ডব, যা শেষে আবিষ্কৃত হয় একের পর এক গণকবর। এই ভয়াবহ ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ছাড়াও দুই সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, বিজিবি সদস্য এবং বেসামরিক ব্যক্তিরা প্রাণ হারান।
বিগত ১৭ বছরে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ও প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। ২০০৯ সালে গঠিত জাতীয় তদন্ত কমিটি এবং সেনা তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তার সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশন গত নভেম্বরে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে, আগের তদন্তগুলোতে প্রকৃত রহস্য আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল। প্রতিবেদনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ জন রাজনৈতিক নেতা এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে। বর্তমান সরকার এখন এই ট্র্যাজেডির পুনঃতদন্তের জন্য নতুন একটি কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
মামলার বিচারিক কার্যক্রমের দিকে তাকালে দেখা যায় যে এটি আসামির সংখ্যার দিক থেকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মামলা। হত্যাকাণ্ডের মামলায় ২০১৩ সালে বিচারিক আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে হাইকোর্ট ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেন।
মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটির বিচার এখনো চলমান যেখানে এক হাজার তিনশোর বেশি সাক্ষী রয়েছেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে যে সাক্ষীদের জবানবন্দিতে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে বলেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী ষড়যন্ত্র ছিল এবং বর্তমান সরকার এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও সত্য প্রকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জাতি এখন অপেক্ষায়, কবে দেখবে এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিচার ।

