ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার চিরচেনা কর্মব্যস্ততা আর উৎকণ্ঠার ভিড়ে আজ এক অনন্য গল্পের জন্ম হলো। যে গল্পটি কেবল জিপিএ বা ভালো ফলের লড়াই নয়, বরং এক নবজাতকের কান্না আর একজন মায়ের আকাশ ছোঁয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষার আখ্যান।
পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে তখন তপ্ত রোদে অভিভাবকদের ভিড়। তারই এক কোণে দেখা গেল এক বৃদ্ধাকে, যার কোলে পরম মমতায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে মাত্র ২২ দিনের একরত্তি শিশু। শিশুটি যখন ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে উঠছে, তখন তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টায় নানু ফিসফিস করে বলছেন, “কান্না করো না বাবু, মা পরীক্ষা দিচ্ছে তো। মা এলেই তোমার খিদে মিটবে, তুমি একটু ঘুমাও সোনা।”
মাত্র ২২ দিন আগে মা হয়েছেন সালমা আক্তার। স্বাভাবিক প্রসবের ধকল আর পরবর্তী শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যেখানে পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন, সেখানে সালমা বেছে নিয়েছেন সংগ্রামের পথ। শরীরের ক্লান্তি আর সন্তানের প্রতি টান, সব মিলিয়ে এক অস্থিরতা কাজ করার কথা থাকলেও সালমা ছিলেন শান্ত। কারণ তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢোকার আগে যখন দ্বিধায় ভুগছিলেন সালমা, তখন তার মা-ই হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে বড় শক্তি। মেয়েকে সাহস দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “তুমি পরীক্ষা দাও, বাবুরে নিয়া তুমি চিন্তা করো না। আমি তো আছি।” একজন মায়ের এই যে পরম নির্ভরতার আশ্বাস, এটাই সালমাকে টেনে নিয়ে গেছে পরীক্ষার বেঞ্চে।
পরীক্ষার হলের নীরবতায় সালমা যখন উত্তরপত্রের বৃত্ত ভরাট করছিলেন, বাইরে তখন তার মা লড়ছিলেন ২২ দিনের নাতনিকে সামলানোর অন্য এক যুদ্ধে। এই দৃশ্যটি যেন এক চমৎকার রূপক, এক মা স্বপ্ন দেখছেন, আর অন্য মা সেই স্বপ্নকে ডানা মেলার সুযোগ করে দিতে নাতনিকে বুকে আগলে রাখছেন।
সময়ের কাঁটা যত এগোচ্ছিল, শিশুটি একসময় শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। হয়তো সে-ও তার অবুঝ মনে বুঝতে পেরেছিল, তার মা আজ এক বিশাল লড়াইয়ে নেমেছে। মাতৃত্ব যে নারীর অগ্রযাত্রায় শিকল নয়, বরং ডানা হতে পারে, সালমা আক্তার আজ তারই জীবন্ত প্রমাণ।
ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল যাই হোক না কেন, জীবনের কঠিন পরীক্ষায় সালমা আক্তার আজ বিজয়ী। মা এবং নাতনির এই মায়াবী সহমর্মিতা আর সালমার হার না মানা মানসিকতা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ, যে মেয়ে পাশে একজন মা এসে দাঁড়ান এবং বলেন “আমি তো আছি”, সেই মেয়ের স্বপ্নকে রুখে দেওয়ার সাধ্য কার?

