১৫ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধে বিল পাস ফ্রান্সে
ছবিঃ বিপ্লবী বার্তা
ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করতে একটি বিল দেশটির জাতীয় পরিষদে পাস হয়েছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। সোমবার নিম্নকক্ষের আইনপ্রণেতারা বিলটির মূল বিষয়গুলোতে একমত হন। পরে ১১৬–২৩ ভোটে বিলটির পক্ষে রায় দেন তারা। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। খবর- বিবিসি


পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সোম থেকে মঙ্গলবার  রাতভর চলা এক অধিবেশনে বিলটি নিয়ে ভোটাভুটি হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ১৩০টি, আর বিপক্ষে ভোট পড়েছে ২১টি। এখন বিলটিকে ফ্রান্সের উচ্চকক্ষ সিনেটে পাঠানো হবে। সেখানে পাস হওয়ার পর এটিকে আইনে পরিণত করা হবে। প্রস্তাবিত এ আইনের আওতায় ফ্রান্সে হাইস্কুলগুলোতে মুঠোফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছে।


দেশটির জাতীয় পরিষদে সোম থেকে মঙ্গলবার রাতভর চলা অধিবেশনের পর বিলটি পাস হওয়ার ঘটনায় প্রেসিডেন্ট মাখোঁ একে 'একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ' বলে অভিহিত করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই ভোটকে ফরাসি শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষার জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সরকারকে পরবর্তী ধাপগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান, 'যাতে আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যায়'। ফ্রান্সে ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। তিনি লেখেন, 'আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ক বিক্রির জন্য নয়।'


বিলটির উদ্যোক্তা এমপি লর মিলার ল্য মঁদ পত্রিকাকে বলেন, 'এই আইনের মাধ্যমে আমরা সমাজে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিচ্ছি।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা খুব সহজ একটি কথা বলছি—সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো নিরীহ বা ক্ষতিবিহীন নয়।' মিলারের ভাষায়, 'এই নেটওয়ার্কগুলো মানুষকে একত্রিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তারা মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তারা তথ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তথ্যের ভারে আমাদের ডুবিয়ে দিয়েছে। তারা বিনোদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু মানুষকে বন্দি করে ফেলেছে।'


নতুন খসড়া অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্ষতিকর বলে বিবেচিত সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কগুলোর একটি তালিকা তৈরি করবে। ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সেগুলো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে। অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর সাইটগুলোর জন্য একটি আলাদা তালিকা থাকবে। এসব সাইট ব্যবহার করতে হলে বাবা-মায়ের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আরেকটি ধারায় সিনিয়র স্কুলগুলোতে (লিসে) মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। জুনিয়র ও মিডল স্কুলগুলোতে এই নিষেধাজ্ঞা আগেই কার্যকর রয়েছে।


আইনটি পাস হলে ফ্রান্সকে বয়স যাচাইয়ের একটি পদ্ধতির বিষয়ে একমত হতে হবে। দেশটিতে বর্তমানে ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের অনলাইন পর্নোগ্রাফি দেখার ক্ষেত্রে বয়স প্রমাণের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে।


ইউরোপে ডেনমার্ক, গ্রিস, স্পেন ও আয়ারল্যান্ডও অস্ট্রেলিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণের কথা ভাবছে। এ মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্য সরকার ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার বিষয়ে জনমত গ্রহণ শুরু করেছে। প্রস্তাবিত ফরাসি আইনের ভিত্তি হলো গত বছরের শেষ দিকে লর মিলারের তৈরি করা একটি খসড়া। তিনি টিকটক ও অন্যান্য নেটওয়ার্কের মানসিক প্রভাব নিয়ে তদন্তকারী একটি সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব করেছিলেন।


আলাদাভাবে সরকারকেও নিজস্ব আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কারণ মাখোঁ তাঁর ক্ষমতার শেষ বছরে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে ২০২৩ সালের একটি আইনে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে আদালত সেটিকে ইউরোপীয় আইন লঙ্ঘনকারী বলে রায় দেওয়ায় আইনটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।


সোমবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বোর্ন এ পদক্ষেপ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘ফ্রান্স টু’কে বলেন, ‘বিষয়টা এতটা সহজ নয়।’ এলিজাবেথ বোর্ন আরও বলেন, ‘প্রথমে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে।’