কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদে চিলমারী–রৌমারী নৌপথে ফেরি চলাচল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এই রুটের যাত্রীরা। ফেরি বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় পারাপার করতে হচ্ছে মানুষকে। এতে যেমন বেড়েছে যাতায়াত ব্যয় ও সময়, তেমনি প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। অন্যদিকে, ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসানে পড়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)।
ফেরি সার্ভিস চালু থাকলে যাত্রীরা কম খরচে এবং নিরাপদে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতেন। কিন্তু কবে নাগাদ ফেরি সার্ভিস পুনরায় চালু হবে—এ প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর পাচ্ছেন না যাত্রীরা। উদ্বোধনের পর ৮৫১ দিনের মধ্যে ৪৩২ দিনেই ফেরি সার্ভিস ফেরি বন্ধ ছিলো।
যাত্রীরা জানান, সূর্যোদয়ের পরই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জড়ো হন শত শত মানুষ। কেউ অপেক্ষা করেন চিলমারী ফেরিঘাটে, কেউ রৌমারী ঘাটে। অনেকের সঙ্গে থাকে মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল। সবার দৃষ্টি থাকে নদীর বুকে নোঙর করা ফেরিগুলোর দিকে। প্রতিদিনই একটাই প্রশ্ন—আজ কি ফেরি চলবে? কিন্তু অধিকাংশ দিনই সেই প্রশ্নের কোনো ইতিবাচক উত্তর মেলে না।
কুড়িগ্রামের চিলমারী ও রৌমারী ফেরিঘাটে এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এটি পরিণত হয়েছে যাত্রীদের নিত্যদিনের বাস্তবতায়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা যায়, চিলমারী–রৌমারী নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু হয় ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। উদ্বোধনের পর ‘কুঞ্জলতা’ ও ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ নামের দুটি ফেরি এই রুটে চলাচল শুরু করে। পরে ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ সরিয়ে ‘কদম’ নামের আরেকটি ফেরি যুক্ত করা হয়।
এক সময় পর্যন্ত ‘কুঞ্জলতা’ ও ‘কদম’—এই দুটি ফেরি নিয়মিতভাবে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন পারাপার করছিল। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদের অতিরিক্ত সিলটেশন (পলি জমা), ডুবোচর সৃষ্টি এবং অনিয়মিত ড্রেজিংয়ের কারণে ধীরে ধীরে নাব্যতা সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এর ফলে ফেরি চলাচল ক্রমেই ব্যাহত হতে থাকে।
চিলমারী ফেরিঘাটের লিপিবদ্ধ তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনের পর প্রথম ১০৪ দিনের মধ্যে ফেরি চলেছে ৯৭ দিন। ২০২৪ সালে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ফেরি চলেছে ২৪১ দিন। ২০২৫ সালে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ফেরি চলেছে মাত্র ৮০ দিন। চলতি বছর ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত একদিনও ফেরি চলেনি।
রৌমারী ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রী মানিক চন্দ্র বলেন, তাকে নিয়মিত কুড়িগ্রাম শহরে যেতে হয়।“ফেরি চালু থাকলে মোটরসাইকেলসহ মাত্র ১০০ টাকায় পার হতে পারি। এখন নৌকায় মোটরসাইকেলসহ যেতে ৪০০ টাকা লাগে। টাকাও বেশি, ঝুঁকিও আছে। ফেরি চালুর সময় আমরা আশার আলো দেখেছিলাম, কিন্তু এখন সেটাই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে,” বলেন তিনি।
চিলমারী ঘাটে আসা আরেক যাত্রী আব্দার হোসেন বলেন, পেশাগত কাজে তাকে প্রায়ই রৌমারী, রাজীবপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে যেতে হয়।
“ফেরি থাকলে মোটরসাইকেলে নিরাপদে যাতায়াত করা যেত। এখন বেশি টাকা খরচ করে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হতে হয়। নিয়মিত ফেরি চললে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক এগিয়ে যেত,” বলেন তিনি।
চিলমারী নৌবন্দর এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান বলেন, “উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে—এমন প্রত্যাশা নিয়েই ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চিলমারী–রৌমারী ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছিল। কিন্তু আড়াই বছরের মাথায় এসে সেই সম্ভাবনাময় নৌপথ এখন অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, নাব্যতা সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ফেরি বন্ধ থাকায় যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনকে বিকল্প পথে ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ পুরো অঞ্চলের মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সমীর পাল বলেন, “চিলমারী–রৌমারী ফেরিপথ প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা দেশের অন্যতম বড় ফেরিপথ। ব্রহ্মপুত্র নদের অতিরিক্ত সিলটেশনের কারণে এখানে সারা বছর ড্রেজিং চালু রাখা জরুরি। বর্তমানে সরকারি দুটি ড্রেজার দিয়ে চিলমারী ও রৌমারী অংশে নাব্যতা সংকট নিরসনের কাজ চলছে।”
বিআইডব্লিউটিসি চিলমারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) প্রফুল্ল চৌহান বলেন, “নাব্যতা সংকটের কারণে বর্তমানে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝখানে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় হকের চর এলাকায় ফেরি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুম ছাড়া ফেরি চালুর তেমন সুযোগ থাকে না।”
তিনি জানান, ফেরি বন্ধ থাকায় প্রতি মাসে বিআইডব্লিউটিসিকে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এছাড়া বন্দরের অন্তত ২০ জন কর্মচারী কার্যত অলস সময় পার করছেন।
“ড্রেজিং সম্পন্ন হওয়ার পর ফেরি সার্ভিস পুনরায় চালু হবে। তবে কবে নাগাদ চালু হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না,” বলেন তিনি।

